দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
সর্ব-শেষ হাল-নাগাদ: ২৯ অক্টোবর ২০১৪

ভূমিকম্প ও অন্যান্য দুর্যোগে উদ্ধার ও অনুসন্ধান তৎপরতায় সক্ষমতা বৃদ্ধি

ভূমিকম্প ও অন্যান্য দুর্যোগে উদ্ধার ও অনুসন্ধান তৎপরতায় সক্ষমতা বৃদ্ধিঃ

          সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্হানে দফায় দফায় মৃদু ভূকম্পন অনভূত হচ্ছে। এতে মানুষের মধ্যে প্রবল আতংক বিরাজ করছে। এ ব্যাপারে যেহেতু পূর্বাভাস দেয়া এখনও সম্ভব নয়, সেহেতু সরকার ভূমিকম্প  মোকাবেলায় সরকার যে সকল ব্যবস্হা নিচ্ছে তা নিম্নরূপঃ

 

(ক) ভূমিকম্প ঝুঁকি মানচিত্র তৈরিঃ ভৌগোলিক অবস্থান, ভূত্তাত্ত্বিক গঠনের জন্য দেশে ভূমিকম্প সংঘটিত হওয়ার আশংকা রয়েছে। সিলেট সীমান্তে সক্রিয় ডাউকি ফল্ট এর অবস্থান ও টাংগাইলের মধুপুর ফল্ট এর অবস্থান এবং উত্তরপূর্বে সীমান্ত সংলগ্ন ইন্ডিয়ান প্লেট ও ইউরেশিয়ান প্লেট এর সংযোগস্থল হওয়ায় বাংলাদেশ ভূমিকম্পের আশংকামুক্ত নয়। তথ্য ও উপাত্ত বিশ্লেষণ করে ইতোমধ্যেই ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট সিটি কর্পোরেশনের ভূমিকম্প ঝুঁকি মানচিত্র তৈরি করা হয়েছে এবং টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, বগুড়া, রংপুর, দিনাজপুর ও রাজশাহীর ভূমিকম্প ঝুঁকি মানচিত্র তৈরি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

(খ) Standing Orders on Disaster (SOD) হালনাগাদকরণঃ  ভূমিকম্প থেকে আত্মরক্ষামূলক জনসচেতনতা সৃষ্টির জন্য সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। Standing Orders on Disaster (SOD)-২০১০-এ ভূমিকম্পসহ অন্যান্য আপদে ঝুঁকিহ্রাসে সম্পৃক্ত মন্ত্রণালয়, বিভাগ এবং সংস্হার দায়িত্ব ও কর্তব্য নির্ধারণ করে তা হালনাগাদকরণ করা হয়েছে।

(গ) কন্টিনজেন্সী প্ল্যান তৈরিঃ ভূমিকম্পসহ দুর্যোগ পরবর্তী অবস্থা থেকে দ্রুত উত্তরণের জন্য জাতীয় কন্টিনজেন্সী প্লান তৈরি করা হয়েছে। দ্রুত সাড়া প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর, আর্মড ফোর্সেস ডিভিশন ইত্যাদি ও দুর্যোগ  ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর (ডিডিএম), ঘূণির্ঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি (সিপিপি), ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট সিটি কর্পোরেশন এবং সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ওয়াসা, বিটিসিএল, তিতাস, বাখরাবাদ বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্যসেবা ইত্যাদি বিভিন্ন সংস্থার কন্টিনজেন্সী প্লান তৈরি করে তা Simulation exercise এর মাধ্যমে হালনাগাদ করা হচ্ছে।

(ঘ) বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোড বাস্তবায়নঃ  ভূমিকম্প সহনীয় ভবন নির্মাণের কারিগরী তথ্য সন্নিবেশিত করে Bangladesh National Building Code প্রণয়ন ও কার্যকর করার লক্ষ্যে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় কাজ করছে। SOD-র নির্দেশনা অনুযায়ী ভূমিকম্পের ঝুঁকি মোকাবেলার জন্য বিল্ডিং কোড বাস্তবায়ন অপরিহার্য। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় Building Code কার্যকর করতে বিভিন্ন কমিটির মাধ্যমে সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করছে। এ বিষয়টি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গত বছর সিলেট, চট্টগ্রাম, রংপুর ও ঢাকায় একটি করে কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত কর্মশালাগুলোতে প্রাপ্ত সুপারিশসমূহ সমন্বিত করে ‘দেশব্যাপী বিল্ডিং কোড প্রয়োগের একটি পথ নির্দেশনা’ শীর্ষক প্রতিবেদন তৈরি করে গৃহায়ন ও গনপূর্ত মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হয়েছে।

(ঙ) কমিউনিটি স্বেচ্ছাসেবক তৈরিঃ বড় ধরণের কোন দুর্যোগ হলে তা সরকারের একার পক্ষে মোকাবিলা করা অত্যন্ত দুরুহ। তাই ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে এবং সিডিএমপি-র সহায়তায় ৬২,০০০ নগর স্বেচ্ছাসেবক-কে প্রশিক্ষণ দেয়ার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এই স্বেচ্ছাসেবকদের উদ্ধারকার্য ও প্রাথমিক চিকিৎসায় অংশগ্রহণের লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রায় ২৬,০০০ জনকে  প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। গত ০১/৭/২০১১ তারিখে এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে চট্টগ্রামে ভূমিধব্স ঘটলে অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রমে এসব প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক অংশগ্রহণ করেছিল।

(চ) প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বৃদ্ধিঃ  নির্মাণ কাজে গণসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে করণীয় সম্পর্কিত পোস্টার, লিফলেট ছাপিয়ে শহরগুলোতে বিতরণ করা হচ্ছে। ২,১০০ নির্মাণ কর্মীকে ভূমিকম্প সহণীয় টেকসই বিল্ডিং তৈরির প্রশিক্ষণ দেয়ার কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ৪৫০ জন নির্মাণ কর্মিকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। ভূমিকম্পজনিত জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে প্রায় ২০০ জন ইমামকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে এবং এ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম অব্যাহত আছে। গত বছর ১৩ অক্টোবর উদযাপিত ‘আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস’ এবং এ বছর ২৮ মার্চ উদযাপিত ‘জাতীয় দুর্যোগ প্রস্তুতি দিবস’ উপলক্ষ্যে দেশব্যাপী সকল স্কুলে ভূমিকম্প সচেতনতামূলক মহড়া করার নির্দেশনা দেয়া হয়। জেলা ও উপজেলা সদরে অবস্থিত সকল স্কুলে এ ধরণের মহড়া অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া উক্ত মহড়াকে প্রাতিষ্ঠানিক রুপ দেয়ার জন্য স্কুল কারিকুলামে মহড়ার নির্দেশনা সংযুক্ত করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। ছেলে-মেয়েদের সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে তৃতীয় শ্রেণী হতে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত পাঠ্যসূচিতে দুর্যোগ বিষয়ক পাঠ্য অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। ভূমিকম্পের ঝুঁকিহ্রাসের জন্য সরকারি ও বেসরকারি প্রচার মাধ্যমে সচেতনতামূলক কর্মকান্ড গ্রহণ করা হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট /প্রতিষ্ঠানে ভূমিকম্পসহ দুর্যোগ ঝুঁকিহ্রাসের বিষয়ে ২ ঘন্টার প্রশিক্ষণসূচি অন্তর্ভুক্ত করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নগরবাসীর সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য ভূমিকম্পের আগে, ভূমিকম্প চলাকালীন এবং ভূমিকম্প পরবর্তী সময়ে করনীয় শীর্ষক ১০,০০,০০০ লিফলেট এবং ১,০০,০০০ পোষ্টার ছাপিয়ে বিতরণ করা হয়েছে।

(ছ) ভূমিকম্পসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনায় যন্ত্রপাতি ক্রয়ঃ ‘‘Procurement of Equipment for Search & Rescue Operation on Earthquake and Other Disasters’’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় ভূমিকম্পসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে উদ্ধার কার্যক্রমে ব্যবহারের জন্য যন্ত্রপাতিসমূহ ক্রয়ের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সার্বিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি (সিডিএমপি) ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর যৌথভাবে ভূমিকম্প উত্তর উদ্ধার কার্য পরিচালনার জন্য প্রায় ৬৯ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি ক্রয় করেছে। এই সব যন্ত্রপাতি দ্বারা এমনকি পুরনো ঢাকার অলিগলিতে ভূমিকম্পজনিত দুর্যোগ ঝুঁকি মোকাবেলায় কাজ করা সহজ হবে। পরবর্তীতে আরো ২০ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি ক্রয় করে বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স-কে অনুসন্ধান ও উদ্ধার কাজের জন্য এবং কিছু যন্ত্রপাতি ভূমিকম্প গবেষনা ও তথ্য সংগ্রহ সংক্রান্ত বিধায় তা আবহাওয়া অধিদপ্তর, ভূতত্ত্ব জরিপ অধিদপ্তর ও BUET-কে দেয়া হয়েছে। এটি চলমান প্রক্রিয়া। সরকার প্রতি অর্থ বৎসরে দুর্যোগের ঝুঁকিহ্রাসের জন্য বিভিন্ন প্রকল্প/পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ১৬৪ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি ক্রয়ের জন্য প্রকল্প প্রণয়ন করা হয়েছে। ভূমিকম্প ও অন্যান্য দুর্যোগে অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যের জন্য প্রস্তাবিত বর্তমান ১৬৪ কোটি টাকার প্রকল্পে কমিউনিটি স্বেচ্ছাসেবকদের মধ্যে ৬ হাজার জনকে যন্ত্রপাতি সরবরাহ দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

(জ) দেশে ভূমিকম্পসহ যে কোন দুর্যোগ মোকাবেলা, অনুসন্ধান ও উদ্ধার এবং পুনর্বাসন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সরকারের সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা ও সমন্বয় অপরিহার্য। বাংলাদেশের জনসংখ্যার অতিমাত্রায় ঘনত্ব, শহরে জনসংখ্যার চাপ, ভৌগোলিক অবস্থান ও বাস্তবতা ইত্যাদি বিবেচনায় যে কোন ধরণের ভবিষ্যৎ দুর্যোগ মোকাবেলায় জান ও মালের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনার লক্ষ্যে দুর্যোগ ঝুঁকিহ্রাসের সাথে জড়িত সকল সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজন। ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রথম সাড়াদান কর্তৃপক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছে। এই প্রেক্ষিতে বাংলাদেশে ভূমিকম্প দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সেনাবাহিনীকে অধিকতর শক্তিশালী করার লক্ষ্যে তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী ঢাকা শহরকে ১০ টি সেক্টরে বিভক্ত করে “Earthquake Contingency Plan” এর খসড়া প্রস্তুত করেছে।


Share with :